Logo

ধর্ম

প্রশ্ন থেকে ইবাদত: সততার ব্যবসায়িক যাত্রা

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৪

প্রশ্ন থেকে ইবাদত: সততার ব্যবসায়িক যাত্রা

মানুষ জন্মগতভাবেই প্রশ্ন করতে শেখে। একটি শিশু যখন কথা বলতে শুরু করে, তখন তার সবচেয়ে প্রিয় শব্দগুলোর একটি—"কেন?"

এই ছোট্ট প্রশ্নটিই তাকে হাঁটতে শেখায়, চিন্তা করতে শেখায়, সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে শেখায়। পৃথিবীর প্রতিটি জ্ঞান, প্রতিটি আবিষ্কার এবং প্রতিটি সভ্যতার পেছনেও ছিল একটি প্রশ্ন।

ইসলামও মানুষকে অন্ধ অনুসরণের শিক্ষা দেয় না; বরং চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং সত্যের সন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বারবার কুরআনে জিজ্ঞাসা করেছেন, "তোমরা কি চিন্তা করো না? 

তোমরা কি বুঝো না?"—এ যেন মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার এক অবিরাম আহ্বান। এই অনুসন্ধিৎসার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ হযরত ইবরাহিম (আ.)। তিনি নক্ষত্র দেখেছেন, চাঁদ দেখেছেন, সূর্য দেখেছেন। কিন্তু কোনো কিছুকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। 

প্রতিটি দৃশ্যের সামনে তিনি প্রশ্ন করেছেন, ভেবেছেন, বিচার করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করেছেন—যা উদয় হয় আবার অস্ত যায়, তা স্রষ্টা হতে পারে না। প্রশ্ন তাঁকে বিভ্রান্ত করেনি; বরং সত্যের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।

মানুষের জীবনে আরেকটি শিক্ষা খুব নীরবে শুরু হয়—কেনাবেচার শিক্ষা। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়া, কোন মাছটা টাটকা, কোন সবজিটা ভালো, কোথায় দাম একটু কম, কোথায় বেশি—এসব দেখতেই দেখতেই মানুষ বুঝতে শেখে লেনদেনের ভাষা। তখন সে ব্যবসা শেখে না; কিন্তু ব্যবসার ভিত্তিটা শিখে ফেলে।

আমার নিজের জীবনেও এই শিক্ষাটা বই থেকে আসেনি। উত্তরার পাইকারি বাজার (কামারপাড়া আড়তে) "কতকিছুর হাট" পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। ভোররাতে কৃষকের ট্রাক এসে দাঁড়ায়। কেউ দূর জেলা থেকে সবজি নিয়ে আসে, কেউ আবার রাতভর পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে পৌঁছায়। একজন কৃষকের চোখে তখন শুধু একটি প্রত্যাশা—সে যেন ন্যায্য দাম পায়। অন্যদিকে একজন হোটেল মালিক, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী কিংবা খুচরা বিক্রেতা চান—ভালো মানের পণ্য যেন সঠিক দামে পান।

আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, বাজারে সব সময় সবচেয়ে কম দামের মানুষটি জেতে না।

যে মানুষটি কথা রাখে, সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেয়, পণ্যের ত্রুটি থাকলে আগেই জানিয়ে দেয়, ভুল হলে স্বীকার করে—শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা তাকেই খোঁজেন।

অনেক ক্রেতাকে আমি বলতে শুনেছি, "দাম একটু বেশি হলেও সমস্যা নেই, মানুষটা বিশ্বাসের।" সেদিন উপলব্ধি করেছি, ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন টাকা নয়; মানুষের বিশ্বাস।

এই কারণেই ইসলাম ব্যবসাকে শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে দেখেনি। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, "আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)

এই একটি আয়াত শুধু ব্যবসার বৈধতা ঘোষণা করেনি; বরং বুঝিয়ে দিয়েছে, সম্পদ অর্জনের পথও হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং মানবিক। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু তাঁর প্রকৃত সাফল্য ছিল না লাভের অঙ্কে; ছিল মানুষের বিশ্বাসে। তাই তিনি বলেছেন, "সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীগণ, সিদ্দিকীন ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।" (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ১২০৯; হাসান)

এই হাদিস পড়লে মনে হয়, একজন ব্যবসায়ীর প্রতিটি দিনই যেন একটি পরীক্ষা। এখানে লোভ আছে, প্রতিযোগিতা আছে, দ্রুত লাভের সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সুযোগের মধ্যেও যে মানুষটি সত্যকে আঁকড়ে ধরে, প্রতারণা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং মানুষের হক আদায় করে—আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা অসাধারণ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও সতর্ক করে বলেছেন, "যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০২)

এই কথাটি আমি প্রায়ই নিজের ব্যবসার ক্ষেত্রেও মনে করার চেষ্টা করি। কারণ প্রতারণা করে হয়তো একদিন বেশি লাভ করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস হারালে সেই ক্ষতি কোনো হিসাবের খাতায় লেখা যায় না।

আজ প্রযুক্তি বদলেছে। অনলাইনে অর্ডার হয়, মোবাইলে টাকা লেনদেন হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় আজও বদলায়নি—মানুষ এখনো বিশ্বাসের কাছেই ফিরে যায়।

দিনের শেষে একজন ক্রেতা শুধু ভালো পণ্য চান না; তিনি এমন একজন মানুষকে খোঁজেন, যার হাতে নিজের অর্থ তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

আমার কাছে ব্যবসার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই—কেনাবেচা শুধু পণ্য বিনিময় নয়; এটি মানুষের আস্থা অর্জনের একটি দীর্ঘ সফর। আর যখন সেই আস্থা সততা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ব্যবসা আর কেবল জীবিকা থাকে না; সেটি ইবাদতে পরিণত হয়।

হয়তো এ কারণেই ইসলামে একজন সৎ ব্যবসায়ী শুধু সফল উদ্যোক্তা নন; তিনি সমাজের নীরব আস্থার নির্মাতা। তাঁর দোকানে শুধু পণ্য বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় বিশ্বাস। আর বিশ্বাস—এমন এক পুঁজি, যার মূল্য কখনো কমে না। 

লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; ফাউন্ডার, কতকিছুর হাট। ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন